সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২২ পূর্বাহ্ন
কেরানীগঞ্জে ৯৩ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধ, জাল দলিল তৈরির অভিযোগ
কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি :
ঢাকার কেরানীগঞ্জে প্রায় ৯৩ শতাংশ জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখানো, প্রকৃত ওয়ারিশের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিদের ওয়ারিশ হিসেবে উপস্থাপন এবং বিতর্কিত দলিল তৈরির অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতা মো. আনিসুর রহমান মৃধার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
মামলার আরজি, দলিল ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, শুভাঢ্যা মৌজার ওই জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। জমিটির বিভিন্ন রেকর্ডে সিএস, এসএ ও আরএস দাগ নম্বর নিয়ে তথ্য উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, জমির মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন সময়ে একাধিক দলিল তৈরি করা হয়েছে, যার কয়েকটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭০ সালে গুরু ভক্ত ও গোবিন্দ ভক্ত কৃষ্ণ চন্দ্র রাম ও রাম চন্দ্র দাসের কাছে সাফকলা দলিলের মাধ্যমে ২৫ শতাংশ জমি বিক্রি করেন।
পরবর্তীতে একই জমিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে দাতা ও ওয়ারিশ দেখিয়ে দলিল সম্পাদনের অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে কেবল চন্দ্র মণ্ডল ও তাপস মণ্ডলকে ওয়ারিশ হিসেবে দেখিয়ে একটি বিতর্কিত দলিল তৈরি করা হয়।
ওই দলিলে মো. আনিসুর রহমান মৃধা, শাহাবুদ্দিন আহমেদ পিন্টু ও স্বপন চন্দ্র সরকারের নামও রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০১০ সালে কৃষ্ণ চন্দ্র দাস ও রাম চন্দ্র দাসকে দাতা দেখিয়ে একই দাগের ২৫ শতাংশ জমির বিষয়ে ১১,৭১৭ নম্বর দলিলের মাধ্যমে মকবুল হোসেনের নামে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পরে ওই পাওয়ারের ভিত্তিতে মকবুল হোসেন আরও একটি দলিল সম্পাদন করেন বলেও অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
ওয়ারিশ পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে আনন্দ চন্দ্র বিশ্বাসকে দাতা দেখিয়ে কেবল চন্দ্র, তাপসসহ কয়েকজনের নামে জমি হস্তান্তরের দলিল করা হয়। একইসঙ্গে গুরু ভক্ত ও গোবিন্দ ভক্তের সন্তান হিসেবে আনন্দ চন্দ্র বিশ্বাস ও স্বপন চন্দ্র সরকারকে উপস্থাপনের অভিযোগও রয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট ওয়ারিশ সনদের তথ্যের বরাত দিয়ে অভিযোগকারীরা বলছেন, গুরু ভক্ত মণ্ডল ও গোবিন্দ ভক্ত মণ্ডল নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান। ফলে তাদের সন্তান হিসেবে কয়েকজনকে দেখিয়ে দলিল তৈরির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ফরেনসিক পরীক্ষার তথ্য নিয়েও বিতর্ক
বিতর্কিত দলিলের ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ—সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়েছে বলে মামলার আরজি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ফরেনসিক পরীক্ষায় দলিলে থাকা একটি ফিঙ্গারপ্রিন্টের সঙ্গে আনন্দ চন্দ্র বিশ্বাসের ফিঙ্গারপ্রিন্টের মিল পাওয়া গেছে। অথচ একই দলিলে গুরু ভক্তের ছেলে হিসেবে কেবল চন্দ্র দাসকে দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ওয়ারিশ সনদে গুরু ভক্ত নিঃসন্তান ছিলেন বলে উল্লেখ থাকায় দলিলের তথ্য ও ওয়ারিশ সংক্রান্ত নথির মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে বলে দাবি অভিযোগকারীদের।
তবে ফরেনসিক প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ বিষয়বস্তু, নমুনা সংগ্রহের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট দলিলের আইনগত বৈধতা যাচাই না করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, মো. আনিসুর রহমান মৃধা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে জমি-সংক্রান্ত এসব কার্যক্রমে সহযোগিতা করেছেন। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে জমির মালিকানা ও দলিল সংক্রান্ত বিরোধে সংশ্লিষ্টরা সুবিধা পেয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আনিসুর রহমান মৃধার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তাঁর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীরা বলছেন, বিতর্কিত দলিলগুলোর মূল কপি, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট ওয়ারিশ সনদ এবং সিআইডির ফরেনসিক প্রতিবেদন যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে দলিল লেখক, সাক্ষী, কথিত ওয়ারিশ, সুবিধাভোগী এবং জমির দাবিদারদের ভূমিকা তদন্তের আওতায় এনে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।